ঢাকা , শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬ , ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পদোন্নতিহীনতার চোরাবালিতে এবং শিক্ষক সংকটে ভেঙে পড়েছে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা!

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৮-০৮ ১৭:০৪:১৫
পদোন্নতিহীনতার চোরাবালিতে এবং শিক্ষক সংকটে ভেঙে পড়েছে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা! পদোন্নতিহীনতার চোরাবালিতে এবং শিক্ষক সংকটে ভেঙে পড়েছে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা!
মোঃ ওমর ফারুক


দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি বঞ্চিত থেকে চরম অসন্তোষমানসিক কষ্টে রয়েছেন দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সমূহে কর্মরত শিক্ষকগণ।পদোন্নতিবঞ্চিত এই শিক্ষকগণ শুধু আর্থিক ক্ষতির শিকার নন, দীর্ঘ অপেক্ষা ও বৈষম্যের কারণে তাঁদের মনোবলের যে ক্ষতি হয়েছে, পেশার প্রতি যে বিতৃষ্ণা জন্মেছে—তার প্রভাব তাঁদের শ্রেণি-কার্যক্রমেও পড়তে শুরু করেছে! যা এই গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে সুদূরপ্রসারী সংকট তৈরি করতে পারে! মানসিকভাবে একজন হতাশ শিক্ষক একজন সক্রিয় শিক্ষার্থী তৈরিতে পূর্ণ সামর্থ্য দিতে পারেন না—এটাই বাস্তবতা। বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ জেলা ও বিভাগীয় শহরে প্রতিষ্ঠিত সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সমূহ এবং এখানে কর্মরত দক্ষ ও যোগ্য একদল নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক। যুগ যুগ ধরে  জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে মাধ্যমিক শিক্ষাকে একটি মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে এই প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং এর শিক্ষকগণ।


শুধু জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রেই নয়, বরং দেশে বিদেশে বিভিন্ন কো কারিকুলার কার্যক্রমেও একক কৃতিত্ব রেখে আসছে এই স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার বিভিন্ন প্রশাসনিক ও একাডেমিক  পদে পদোন্নতি না হওয়ায় পুরো মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট সংকট নেমে এসেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও প্রশাসনিক কাঠামোর বহু গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য অবস্থায় পড়ে আছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরাধীন বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখার সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনিক


পদসমূহের মধ্যে রয়েছে - প্রধানশিক্ষক ও প্রধানশিক্ষিকা, সহকারী প্রধানশিক্ষক ও সহকারী প্রধানশিক্ষিকা পদ। যে পদগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে না! এছাড়া, বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখার সমগ্ৰেডের জেলা শিক্ষা অফিসার, সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার, বিদ্যালয় পরিদর্শক এবং সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক পদেও দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে। শুধু তাই নয়, বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক পদ; এই গুরুত্বপূর্ণ পদেও পদোন্নতির কোনো উদ্যোগ গ্ৰহণ করা হচ্ছে না! ফলে দীর্ঘদিন ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলোতে পদোন্নতি না দেওয়ার ফলে তা শূন্য পড়ে থাকার কারণে সমগ্র মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসন কার্যত ভেঙে পড়ছে। যদিও কিছু কিছু পদে ভারপ্রাপ্ত, চলতি, অতিরিক্ত দায়িত্ব নাম দিয়ে সাময়িক ভাবে কাজ চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা লক্ষণীয়। তবে এ জাতীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নানা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মকর্তাদের। যদিও এই সেক্টরে যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষকগণ যুগের পর যুগ পর একই পদে চাকরি করেও বিধিগত কারণে পদোন্নতির সুযোগ পাচ্ছেন না। এবং পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েই দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানছেন। অথচ বিধি সংশোধনের ব্যাপারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের থেকে লক্ষণীয় নয়! আবার সংশ্লিষ্ট শিক্ষকগণের তৎপরতায় যদিও বা বিধি সংশোধনের দুই একটি মিটিং মন্ত্রণালয় আহবান করে থাকেন কিন্তু নানা জটিলতায় সেগুলিও বারবার স্থগিত হয়। ফলে শিক্ষকদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না!  যার ফলে পদোন্নতি বঞ্চিত থেকেই এক বুক হতাশা ও কষ্ট নিয়ে গত এক দশকে হাজারো শিক্ষক তাদের দীর্ঘ চাকরি জীবন শেষ করেছেন।


সরকারি শূহিসেবেইন্য পদের ভয়াবহ চিত্র: মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে গত ২৫ মার্চ ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে প্রেরিত সর্বশেষ স্মারক (নং: ৩৭.০২.০০০০.১০১.৯৯.০০২.২০২৩.১৬৭৮) অনুযায়ী সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাখাতে বিদ্যমান শূন্য পদের পরিসংখ্যান নিম্নরূপ: ক্র.নং পদের নাম মোট প্রতিষ্ঠান মোট পদ সংখ্যা কর্মরত পদ শূন্য পদ ১ প্রধান শিক্ষক/শিক্ষিকা ৭০২ ৫৭২ ১৯৩ ৩৭৯ ২ সহকারী প্রধান শিক্ষক/শিক্ষিকা ৭০২ ৭০৩ ১৭৫ ৫২৮ ৩ সিনিয়র শিক্ষক/শিক্ষিকা (বিষয়ভিত্তিক) ৭০২ — ৩৯২৭ — ৪ সহকারী শিক্ষক/শিক্ষিকা (বিষয়ভিত্তিক) ৭০২ ১৬১৪১ ১০০৯৩ ৬০৪৮ ৫ বিদ্যালয় পরিদর্শক/পরিদর্শিকা ৯ ১৬ — ১৬ ৬ সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক/পরিদর্শিকা ৯ ১৬ — ১৬ ৭ জেলা শিক্ষা অফিসার ৬৪ ৬৪ ৪১ ২৩ ৮ সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার ৬৪ ৬৪ — ৬৪ ৯ উপজেলা/থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ৪৯৬ ৪৯৬ ১৮১ ৩১৫ ১০ সহকারী উপজেলা/থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ৪৯৬ ৪৯৬ ১৮৯ ৩০৭ উপরের সারণি থেকে দেখা যাচ্ছে যে, সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসারের ৬৪টি পদের বিপরীতে একটি পদেও কেউ কর্মরত নেই, অর্থাৎ এই পদের শূন্যতা ১০০%। একই চিত্র বিদ্যালয় পরিদর্শক ও সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শকের ক্ষেত্রেও!  আবার উপজেলা/থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের ৪৯৬টি পদের মধ্যে ৩১৫টিই শূন্য (প্রায় ৬২ শতাংশ)। প্রধান শিক্ষকের ৫৭২টি পদের মধ্যে ৩৭৯টি শূন্য (৬৬ শতাংশ)। আবার, একই সারণীতে একাডেমিক পদের এন্ট্রি পদ হিসেবে সহকারী শিক্ষকের ১৬,১৪১টি পদের মধ্যে ৬,০৪৮টি  পদ শূন্য (৩৮ শতাংশ) রয়েছে। উল্লেখ্য এই তথ্য কোনো বিরোধীমহলের প্রচারণা নয়, এটি সরকারের নিজস্ব দলিল। তবে উপরের সারণীতে গুরুত্বপূর্ণ একটি একাডেমিক পদোন্নতি যোগ্য পদের পরিপূর্ণ তথ্য আসেনি! পদটি হলো সিনিয়র শিক্ষকের পদ। বিধি মোতাবেক যেখানে মোট সহকারী শিক্ষক এর ৫০ ভাগ পদ হবে সিনিয়র শিক্ষকের পদ। সেই হিসেবে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত মোট সহকারী শিক্ষক সংখ্যা ১৬,১৪১ টি। যার ৫০ ভাগ পদ হবে সিনিয়র শিক্ষক অর্থাৎ ৮,০৭০ টি পদ। যেখানে কর্মরত শিক্ষক সংখ্যা মাত্র ৩,৯২৭ জন। তথ্য যাচাই করে দেখা যাচ্ছে যে, এই পদে পদোন্নতি যোগ্য পদ শূন্য রয়েছে ৪,১৪৩টি (শতকরা ৫১ ভাগ)। অর্থাৎ মোট একাডেমিক পদের বিপরীতে শুন্য পদের সংখ্যা (সহকারী শিক্ষক ৬,০৪৮+ সিনিয়র শিক্ষক ৪,১৪৩) টি বা ১০,১৯১ টি! অর্থাৎ একাডেমিক দুই পদের বিপরীতে শুন্য পদ শতকরা ৪২ ভাগ! এতো বিশাল একাডেমিক শিক্ষক সংকট বা শুন্যতা নিয়ে শতভাগ সেবা দিয়েও নিজেদের প্রাপ্য সম্মান, মর্যাদা এমনকি হাজার হাজার শুন্য পদ থাকা সত্ত্বেও পনের -ষোল বছর ধরে চাকরি করেও বিধিগত প্রাপ্য পদোন্নতির অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে এই হতভাগা শিক্ষকদের! দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির দরজা বন্ধ, হতাশা থেকে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে: সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষকের সাধারণত প্রথমে সিনিয়র শিক্ষক, তারপর সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং পরে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির কথা থাকলেও বাস্তবে এই পদোন্নতির ধারাবাহিকতা দীর্ঘদিন ধরে কার্যত স্থবির হয়ে রয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষকগণ সর্বনিম্ন ১৫ বছর থেকে ৩০ থেকে ৩২ বছর একই পদে দায়িত্ব পালন করে কোনো পদোন্নতি না পেয়ে অবসরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। আর কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যার প্রভাব সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রমে পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। যদিও এই ব্যর্থতার পেছনে কোনো একক কারণ খুঁজে পাওয়া যায় নি। প্রশাসনিক স্থবিরতা ও দীর্ঘসূত্রতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা; সবকিছু মিলিয়ে পদোন্নতির প্রক্রিয়া বর্তমানে কার্যত একটি অচল যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। একদিকে হাজার হাজার এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শত শত পদ শূন্য, অন্যদিকে যোগ্য প্রার্থীরা পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ক্লান্ত—এই অদ্ভুত পরিহাস যেন আজ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাখাতের নিয়তিতে পরিণত হয়েছে! শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং শিক্ষা কার্যালয়ের প্রশাসনিক শূন্যতার বহুমুখী প্রভাব: প্রধানশিক্ষক/ শিক্ষিকার পদ শূন্য থাকলে বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনা ও সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। একজন  পদোন্নতি প্রাপ্ত দক্ষ প্রধানশিক্ষক/ শিক্ষিকা বিদ্যালয়ের একাডেমিক নেতৃত্ব, শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ক, শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা ও সার্বিক মান নিশ্চিতকরণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখেন। শূন্যপদে ভারপ্রাপ্ত , চলতি বা অতিরিক্ত দায়িত্বের নামে পরিচালিত একটি বিদ্যালয়ে এই নেতৃত্বের শূন্যতা স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। একইভাবে জেলা শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের পদ শূন্য থাকলে মাঠপর্যায়ে তদারকি, পরিদর্শন ও সমস্যা সমাধান কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তাছাড়া, শিক্ষক নিয়োগ, বদলি ও শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণে এই পদসমূহের রয়েছে গুরুত্ব ভূমিকা। বিদ্যালয় পরিদর্শক ও সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক পদগুলো পুরোপুরি শূন্য পড়ে থাকার অর্থ হলো মাঠপর্যায়ে বিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক মান মূল্যায়নের কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামোই কার্যকর নেই। মূলতঃ এর সামগ্রিক প্রভাব পড়ছে সরাসরি শিক্ষার্থীদের ওপর। যে বিদ্যালয়ে প্রধানশিক্ষক বা প্রধানশিক্ষিকা নেই, যেখানে শিক্ষক সংকট প্রকট, যেখানে পরিদর্শন হয় না, আবার শিক্ষকদের পদোন্নতিও হয় না; সেখানে শিক্ষার মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা সহজেই অনুমেয়। একাডেমিক শিক্ষক পদের শুন্যতা, আরেকটি গভীর ক্ষত: উপরে বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী, সহকারী শিক্ষকের মোট ১৬,১৪১টি পদের বিপরীতে ৬,০৪৮টি পদ শূন্য—যা মোট পদের প্রায় ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি তিনটি পদের বিপরীতে একটিতে কোনো শিক্ষক নেই। আবার, সিনিয়র শিক্ষকের মোট ৮,০৭০টি  পদের বিপরীতে ৪,১৪৩টি পদ শূন্য -যা মোট পদের প্রায় ৫১ শতাংশ। এই বিপুলসংখ্যক শূন্য পদের কারণে বর্তমানে বিদ্যালয়গুলোতে সঠিকভাবে পাঠদান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবার অনেক বিষয়ে বিষয় শিক্ষকই নেই; ফলে শিক্ষার্থীরা সঠিক নির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই সংকট নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে নিয়োগ প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে। অথচ যাঁরা কর্মরত আছেন তাঁদের পদোন্নতি দিয়ে উপরের পদগুলো পূরণ করলে নিচে যে শূন্যতা তৈরি হতো তা নতুন নিয়োগে পূরণ করা সহজ হতো। কিন্তু পদোন্নতি না হওয়ায় এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটিও থেমে আছে। হতাশার চোরাবালিতে সরকারি মাধ্যমিক: এই সেক্টরে কর্মরত এমন বহু শিক্ষক রয়েছেন যাঁরা ১৯৯১, ১৯৯২, ১৯৯৪, ১৯৯৫, ১৯৯৭ এবং ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে স্বপ্ন দেখতেন একদিন প্রধান শিক্ষক হবেন, জেলা পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু ২০২৬ সালে এসেও তাঁরা সেই একই অর্থাৎ সহকারী শিক্ষক (১০ম গ্রেড) এবং কেউ কেউ সর্বশেষ ২০২১ সালের ৩০ জুন তারিখে সিনিয়র শিক্ষক (৯ম গ্ৰেড) পদে নন ক্যাডার পদে পদোন্নতি নামের প্রহসনের আসন অলংকৃত করে ঐ পদে বসেই অবসরের দিন গুনছেন! পদোন্নতিবঞ্চিত এই শিক্ষকরা শুধু আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন ব্যাপারটা সেখানেই শুধু সীমাবদ্ধ নয় , দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও বৈষম্যের কারণে তাঁদের মনোবলের যে ক্ষতি হয়েছে, পেশার প্রতি যে বিতৃষ্ণা জন্মেছে; তার প্রভাব তাঁদের শ্রেণি-কার্যক্রমেও পড়ছে। এর খেসারত জাতিকে দীর্ঘদিন ধরে দিতে হবে বলে আশংকা করছি! যা সত্যিই দুঃখজনক! একজন হতাশার চোরাবালিতে নিমজ্জিত শিক্ষক একজন সক্রিয় শিক্ষার্থী তৈরিতে কখনোই পূর্ণ সামর্থ্য দিতে পারেন না—এটাই চরম বাস্তবতা। তাছাড়া , দেশের মেধাবী তরুণরা যখন দেখেন যে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সমূহে কর্মরত শিক্ষকদের ৩০ বছরেও পদোন্নতি দেওয়া হয় না, তখন কি তাঁরা এই পেশায় আসতে উৎসাহিত হবেন? দীর্ঘমেয়াদে এই অবস্থা ভবিষ্যতে মেধাবী জনশক্তির আগমনকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং মাধ্যমিক শিক্ষায় এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক মানের উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে! সচেতন নাগরিক ও শিক্ষা বিষয়ক সকল চিন্তাশীল মানুষের একটাই প্রশ্ন: কেন এই পদোন্নতিহীনতা? প্রশ্ন হলো কে জানে না যে হাজারো পদ শূন্য? অবশ্যই জানে। কারণ এই তথ্য তো স্বয়ং সরকারের নিজস্ব দপ্তর থেকেই সংগ্ৰীহিত। তাহলে কেন শিক্ষকদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে না? এই প্রশ্নের সদুত্তর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে! অভিযোগ রয়েছে পদোন্নতির তালিকা প্রস্তুত থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রিতা ও অনীহার কারণে আলোর মুখ দেখছে না। আবার, অনেক ক্ষেত্রে মামলা-মোকদ্দমা বা আইনি জটিলতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এই যুক্তিগুলো হাজারো শিক্ষকের তিন দশকের প্রতীক্ষার যুক্তিসংগত উত্তর হতে পারে না। করণীয় বিষয়ে সুপারিশ: এই অবস্থা আর চলতে দেওয়া যায় না। মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং কর্মরত শিক্ষকদের মুখে হাসি ফোটাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের আকুল আবেদন: ১. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতা পরিহার করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক শূন্য পদে যোগ্য শিক্ষকদের পদোন্নতি এবং পদায়ন দেওয়া হোক। ২. বিসিএস নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালা-১৯৮১ এর সংশোধিত অংশের গেজেট প্রকাশের উদ্যোগ নিয়ে অনতিবিলম্বে দীর্ঘ দিন ধরে আটকে থাকা প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং জেলা/ সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া চালু করা হোক। ৩. সহকারী শিক্ষকদের শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য দ্রুত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে অথবা বিকল্প  উপায়ে ( বিসিএস নন ক্যাডার থেকে) নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদী পড়াশোনার ক্ষতি না হয়। ৪. শিক্ষকদের জন্য একটি সম্মানজনক ও স্বয়ংক্রিয় পদোন্নতির নীতিমালা (শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবি সরকারি কলেজের ন্যায় ৪ অথবা ৬ স্তরীয় একাডেমিক পদোসোপান) প্রণয়ন করা হোক, যাতে কাউকেই ১৫ থেকে ৩০ বছর ধরে একই পদে আটকে থাকতে না হয়।


৫. একটি স্থায়ী বদলি নীতিমালা প্রণয়ন করা হোক এবং বদলীর জন্য আবেদনকারী শিক্ষক/ শিক্ষা কর্মকর্তাদের ডেটাবেজ তৈরি করে তা সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়ে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে আবেদনের প্রেক্ষিতে নীতিমালা অনুযায়ী অগ্ৰাধিকার ভিত্তিতে বদলীর ব্যবস্থা চালু করা হোক। (তথ্যসূত্র: মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের স্মারক নং ৩৭.০২.০০০০.১০১.৯৯.০০২.২০২৩.১৬৭৮, তারিখ: ২৫/০৩/২০২৬) লেখক: মোঃ ওমর ফারুক সহকারী শিক্ষক (বাংলা) সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, খুলনা ও সমন্বয়ক, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (বাসমাশিস), কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি।


নিউজটি আপডেট করেছেন : lifestyledesign847@gmail.com

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ